Guardian Publication Logo
  • En
  • বাংলা
ln.Praptisthan
  • ln.Home1
  • ক্যাটালগ
  • ln.Cart
  • ln.Login

মোট আইটেম (০)

আপনার ক্রয় তালিকা খালি

যে ভুলে পতন ডেকে আনে সাদ্দাম হোসেন
15 April, 2026

যে ভুলে পতন ডেকে আনে সাদ্দাম হোসেন

১৬ জানুয়ারি, ১৯৯১; রাত ১:০০টা

চারটি স্পেশাল অপারেশন হেলিকপ্টার এসকর্টে চার জোড়া অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কোনো রকম আলো ছাড়াই নিচ দিয়ে উড়ে ইরাকের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে। নিশানা ইরাকি রাডার স্টেশন। কপ্টারগুলো থেকে রাডার সিস্টেম বরাবর ছুটে যায় লেজার গাইডেড মিসাইল। একই সাথে চলে গান ফায়ার। অন্তত দুটি রাডার স্টেশন ধ্বংস করে দিয়ে ইরাকি আকাশসীমা ছাড়ে হেলিকপ্টারগুলো। রাডারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে আটটি F-15 যুদ্ধবিমান ইরাকের আকাশে ঢুকে যায়। এর ঘণ্টাখানেক বাদেই আক্রমণে যুক্ত হয় F-117-G স্টিলথ এয়ারক্রাফট। বাগদাদ ও দক্ষিণ ইরাকের সরকারি স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করে সমানে চলে বোমা হামলা।


বিমান আক্রমণের বিরতিতে মার্কিন নৌজাহাজ থেকে ছোড়া টোমাহক ক্রুজ মিসাইল বাগদাদ নগরীকে কাঁপিয়ে দেয়। সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙা মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। হঠাৎ-ই ইরাকের আকাশে উড়তে শুরু করে আমেরিকার B-52 বোমারু বিমান। তবে কি এক মৃত্যু উপত্যকা হতে যাচ্ছে বাগদাদ!


প্রথম দফাতেই ১৫০ ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয় ইরাকি মিলিটারি বেইস, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা আর যোগাযোগ স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে। এর আগে কোনো যুদ্ধে স্টিলথ বিমান, লেজার গাইডেড মিসাইল ও টোমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করা হয়নি। ইরাকও তার দুর্বল সব অস্ত্রশস্ত্র ও মিসাইল দিয়ে প্রতিরোধের বৃথা চেষ্টা চালায়। বহুজাতিক বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে ইজরাইল ও সৌদি আরবের দিকে ছুটে যায় দুর্বল প্রযুক্তি ও ওয়ারহেডের ইরাকি স্কাড মিসাইল। অথচ ইজরাইল তখনও যুদ্ধের কোনো পক্ষ নয়; বরং দেশটি তখন নতুন আরেকটি আরব-ইজরাইল যুদ্ধের সম্ভাব্য সূচনার ভয়ে শঙ্কিত।


আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সাদ্দাম হোসেনের বা ইরাকি বাথিস্ট সরকারের গোয়ার্তুমিতেই উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনা হয়েছে। কারণ, সাদ্দাম ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট তার দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে কুয়েত দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইরাক সরকার দাবি করেছিল, কুয়েত তাদের ২৩তম প্রদেশ। অবশ্য যে দুটি দেশের বিবাদে এই বহুজাতিক যুদ্ধ, একসময় তারা উভয়েই ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। যুদ্ধে কুয়েতের পক্ষ নিয়েছিল ব্রিটেন।


সাদ্দাম কর্তৃক কুয়েত আক্রমণে বিশ্ব নেতারা হতবাক হয়ে গেল। দুই দেশের বিরোধিতার কথা তারা জানতেন বটে; কিন্তু এটা কারও কল্পনাতেও ছিল না যে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে নিজের ভূখণ্ড দাবি করে দখল করে বসবে আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র। যে বছর ইরাকি সৈন্যরা কুয়েতে গেল, তার দুই বছর আগেও ইরাক-কুয়েত একে অপরের মিত্র ছিল। উভয়েই নাখোশ ছিল পাশের দেশ ইরানের ইসলামি বিপ্লব নিয়ে। ৮০ থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরাককে অর্থ সহায়তাও দিয়েছিল ক্ষুদ্ররাষ্ট্র কুয়েত। অবশ্য ইরাক ও কুয়েতের এই মৈত্রী ছিল সাময়িক; বরং তাদের বিবাদের ইতিহাসটাই অধিকতর পুরোনো।


ইরাক একসময় শাসিত হয়েছে তুর্কিদের দ্বারা। সে সময় এর প্রদেশ ছিল তিনটি-বসরা, বাগদাদ ও মসুল। আর কুয়েত ছিল বসরারই অংশ। এই ব্যাপারটাই পরবর্তী বছরগুলোতে বিরোধের অন্যতম কারণ হিসেবে থেকে গেছে।


অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কুয়েতে সাবাহ গোত্রের লোকজন এলো। মাছ ধরা, জাহাজ নির্মাণ আর মুক্তা আহরণ করাই ছিল তাদের প্রধান পেশা। সাবাহ গোত্র কখনোই উসমানীয়দের খবরদারি মানতে চায়নি। এজন্য উসমানীয়দের মোকাবিলায় ব্রিটিশদের ডেকে আনে তারা। কিন্তু উসমানীয়দের সাথে প্রকাশ্য কোনো দ্বন্দ্বে যেতে আগ্রহী ছিল না ব্রিটেন। কুয়েতের শেখ মোবারক বারবার ব্রিটিশদের দুয়ারে হাত পেতে বলতে থাকে,আমাদের সাথে একটা চুক্তি করেন। আপনারা এখানে সৈন্য রাখবেন, আর আমাদের নিরাপত্তা দেবেন।’


শেষমেশ ব্রিটেন রাজি হয় অন্য এক কারণে। ব্রিটিশরা জানতে পারল, কুয়েতে একটি রেলওয়ে টার্মিনাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে রাশিয়া। এটি নির্মিত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি তো বটেই, রাজনীতিতেও রাশিয়াকে ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে তাদের জন্য। এসব ভেবেই মূলত ইংরেজরা এই অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী হয়। ১৮৯৯ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা চুক্তিবদ্ধ হয় কুয়েতের সাথে। তখন থেকেই ব্রিটেন পুরোপুরিভাবে কুয়েতে আসে, থাকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। এর দুই বছর বাদে কুয়েত স্বাধীন হলে ইরাকও তাকে স্বীকৃতি দেয়; যদিও এই স্বীকৃতির কথা পরের বছরগুলোতে স্বীকার করেনি ইরাক।


সাদ্দামের অনুমান ছিল, আরবরা বিদেশি সেনা মোতায়েনে সম্মত হবে না। সাথে এও ধারণা করা হয়েছিল, বাইরে যুদ্ধ জড়ানোর মতো পরিস্থিতি আমেরিকার নেই। কিন্তু দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কুয়েত আক্রমণের প্রতিবাদ জানায়। জর্ডানের বাদশাহ হোসেন অনেক চেষ্টা চালিয়েছেন, ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করেছে সৌদি-মিশরও; কিন্তু সংকটের সমাধান হয়নি মোটেই। সবাই চেষ্টা করেছে সাদ্দামকে ঠেকিয়ে রাখতে। কোনো কাজ হয়নি তাতে। এরপর থেকেই মূলত মিশরের হুসনি মুবারক সাদ্দামের ওপর ভরসা হারান।


বিশ্বশান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা রক্ষার্থে ইরাকের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম তা বাস্তবায়ন করে। বাজেয়াপ্ত করা হলো যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ইরাকের সকল সম্পদ। যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণে ইউরোপও ইরাকের সাথে আমদানি-রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। তবে অর্থনৈতিক লোকসানের কারণ দেখিয়ে এই অবরোধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাল আরব দেশ জর্ডান। দেশটির সব তেল আসত ইরাক আর কুয়েত থেকে। ফলে আমেরিকার সাথে তাল মেলালে ইরাকের সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যে তাদের লস হবে ৬৫ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো ক্ষতি হতো; যদি ঘুণাক্ষরেও এই অবরোধে নাক ডোবাত জর্ডান।


আরব লীগ ও ওআইসিতে ইরাকি আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে রেজুলেশন পাস হয়েছিল। তবে ওআইসির রেজুলেশন পাসের পক্ষে ভোট দেয়নি জর্ডান, সুদান, মৌরিতানিয়া, পিএলও ও ইয়েমেন। লিবিয়া ও জিবুতির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন অংশগ্রহণই করেননি। আর বাহরাইন, আরব আমিরাত, কাতার, ওমান প্রথমদিকে ফোর্স নিয়ে যুদ্ধে যায়নি; তাদের সেনাবাহিনী আকারে ছোটো সেই অজুহাতে।

লেখাটি নেওয়া হয়েছে গার্ডিয়ান থেকে প্রকাশিত ‘ব্যাটল ফর পাওয়ার’ বই থেকে।

বইটিতে তেল রাজনীতির ভেতর-বাহির এবং তেল নিয়ে বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটি অর্ডার করতে ক্লিক করুন...

আপনার মন্তব্য লিখুন