• মূলপাতা
  • ক্যাটালগ
  • ক্রয় তালিকা
  • লগইন

মোট আইটেম (০)

আপনার ক্রয় তালিকা খালি

Categories

All Rights Reserved by Guardian Publications

স্বর্ণমূদ্রাকে হটিয়ে ডলার কীভাবে দুনিয়া দখল করল?
02 April, 2026

স্বর্ণমূদ্রাকে হটিয়ে ডলার কীভাবে দুনিয়া দখল করল?

মাত্র ১০০ বছর আগেও পৃথিবীর বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন।

যেমন : প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সম্রাজ্যের পতন হওয়াার আগ পর্যন্ত তারা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যবহার করত।

তা ছাড়া ১৮৮০-১৯১৪ এবং ১৯৪৬-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ স্বর্ণ-রৌপ্যকে বাণিজ্যিক কাজে অর্থের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করত। অর্থাৎ প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পরিমাণ ধাতব মুদ্রা বা কাগজি নোট ছাপাক না কেন, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুত করত এবং তা দ্বারা আন্তর্জাতিক বিনিময় হার নির্ধারণ করত।

যেমন : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ব্রিটেন ও আমেরিকা যথাক্রমে প্রতি ৪.২৫ পাউন্ড এবং ২০.৬৭ ডলার ইস্যুর বিপরীতে মজুত রাখত ১ আউন্স পরিমাণ স্বর্ণ। ফলে ১ পাউন্ড সমপরিমাণ ছিল ৪.৮৬ ডলার। এই পুরো সময়টিকে বল হতো ক্লাসিকেল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের (Classical Gold Standard) যুগ। এ সময় মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। 

প্রকৃতির প্রতিটি গঠন উপাদানের যেমন নিজস্ব একটি চক্র রয়েছে, অর্থব্যবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়। সেই চক্রের মূল নিয়ামক হলো স্বর্ণ-রৌপ্য। শুনে বিস্মিত হবেন, বতর্মান কাগজি নোটভিত্তিক অর্থব্যবস্থা তার জীবনের শেষ যুগে এসে পৌঁছেছে। খুব দ্রুত শুরু হতে যাচ্ছে ইলেক্ট্রনিক কারেন্সির যুগ। এই চক্র শেষ হলে পুনরায় ফিরে আসবে স্বর্ণ-রৌপ্যের যুগ।

২৩ ডিসেম্বার ১৯১৩, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মন্ত্রীসভা ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমকে (সংক্ষেপে ফেড) আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে অনুমোদন দেয়।  সেইসঙ্গে ব্যাংকটিকে ডলার ছাপানো এবং আমেরিকার অর্থনীতি পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকারও প্রদান করা হয়। কিছুদিন পর সরকারি অধ্যাদেশে ডলার ব্যতীত অন্য সব বিনিময়মাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু নতুন এই কারেন্সির ওপর আমেরিকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছিল না। কারণ, মাত্র কয়েক বছর আগে ট্রাস্ট কোম্পানি কেলেঙ্কারির দরুন হাজারো মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছিল। ফলে শুরু থেকেই সবাই ডলারকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং স্বর্ণ-রৌপ্যকে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে অধিক প্রাধান্য দিতে থাকল।

বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে ফেড ডলারের মূল্য ঘোষণা করে-১ আউন্স স্বর্ণ = ২০ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ১ আউন্স স্বর্ণের বিপরীতে ফেড ২০ ডলার ইস্যু করবে। সাধারণ মানুষকে আহ্বান করা হয়, তারা যেন নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে।

ফেড মানুষকে বোঝায়, প্রতিটি ডলার হলো একেকটি চেক নোট। মানুষ যদি ২০ ডলারের প্রতিটি নোট পুনরায় ফেডকে জমা দেয়, তবে সে তার জমাকৃত সম্পদ ফেরত পাবে। JM 043829043-এ ধরনের যে সংখ্যাটি নোটগুলোর ওপর ছাপানো থাকে, তা দ্বারা বোঝায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হিসাবটিতে ইস্যুকৃত নোটটির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ (স্বর্ণ/রৌপ্য) মজুদ করা আছে। চেক নোট (ডলার) ফেরত আসা মাত্রই ব্যাংক গ্রাহককে সে পরিমাণ সম্পদ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। তা ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক নোটের দরুন ইতঃপূর্বে আন্তঃপ্রাদেশিক লেনদেনগুলোতে যে জটিলতা তৈরি হতো, তা এখন ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হবে। কারণ, এখন থেকে পুরো দেশে একটিমাত্র কারেন্সি ব্যবহৃত হবে। কিন্তু ফেড তার কথা রাখেনি। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ডলারের বিপরীতে সাধারণ মানুষের যে সম্পদগুলো সে আত্মসাৎ করেছে, তা আর কখনো ফিরিয়ে দেয়নি।

কী পরিমাণ স্বর্ণের মজুদ নিয়ে ফেড তার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে, সে তথ্য জানা সম্ভব না হলেও কিছু কাল্পনিক তথ্যকে পুঁজি করে এগোনো যাক। ধরে যাক, গোপন আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেডের শেয়ারহোল্ডারগণ সে সময় ২ হাজার টন স্বর্ণ মজুত করল এবং এর বিপরীতে ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করল। এখন তা বাজারে সরবরাহ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশাসনিক ও বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি খরচ মেটাতে প্রেসিডেন্ট উইলসন প্রশাসনের ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু তার রাজস্ব ভান্ডারে এত পরিমাণ অর্থ ছিল না। ফলে তিনি ফেডের নিকট এই পরিমাণ ডলারের জন্য আবেদন করলেন। ফেড ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে প্রদান করল।

ধরুন, তারা প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ২% সুদে ১০ বছর মেয়াদে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিলো। তাহলে ১০ বছর পর সুদে-আসলে কী পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে হবে? কম করে হলেও ১২ বিলিয়ন ডলার! সমস্যা হলো তিনি এত ডলার পাবেন কোথায়? বাজারে তো মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্তিত্ব আছে। সুদের দরুন যে অতিরিক্ত দায়ের জন্ম হয়েছে, তার বাহ্যিক অস্তিত্ব নেই। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিজেরও কোনো প্রিন্টার নেই। সুতরাং, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলারই পরিশোধ করতে পারবেন। বাকিগুলো পরিশোধ করতে পারবেন না। কারণ, পকেটে ৫০ ডলার থাকলে ৫১ ডলার সমমূল্যের পণ্য ক্রয় করা সম্ভব নয়।

সুদের কাছে এখানে সবাই আটকে যায়। কারণ, সুদ থেকে যে অদৃশ্য দায়ের জন্ম হয়, তা সামষ্টিক উপায়ে কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট সাহেবের খরচ বেড়ে গেল কয়েকগুণ। তিনি আবারও ঋণ নিলেন এবং নিতেই থাকলেন। একই সঙ্গে আমেরিকায় আরও অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক গড়ে উঠল। তারাও ফেড থেকে ঋণ নিয়ে তহবিল তৈরি করল। তাদের কাছ থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ঋণ নিল। চারদিক ঋণে ঋণে সয়লাব হয়ে উঠল। প্রতিটি ঋণের ওপর সুদ চেপে বসল। এই সুদ থেকে তৈরি হলো জাতীয় দায়, যার পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। আদৌ কি এই জাতীয় দায় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?

ফেডের দিকে তাকানো যাক। ১৯১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বার ফেডের নিকট ২ হাজার টন স্বর্ণ ছিল। এর বিপরীতে জানুয়ারি মাসে তারা ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে ঋণ দেয়। প্রথম ঋণের পর প্রেসিডেন্ট সাহেব যখন পুনরায় ঋণের আবেদন করলেন, তখন ফেডের সিন্দুক ফাঁকা! অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবারও ডলার প্রিন্ট করল এবং তা প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিকট পৌঁছে দিলো। এই যে দ্বিতীয়বার ডলার প্রিন্ট করল, তার বিপরীতে কি সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত করেছে? তা ছাড়া প্রতিটি ঋণের ওপর যে সুদ চাপিয়ে দিচ্ছে, তারও বিপরীতে কি স্বর্ণ মজুত করছে?

আবার লক্ষ করুন, সাধারণ মানুষ সরকারের হুকুম মানতে নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা দিচ্ছে, আর ফেড প্রিন্টিং মেশিনে ডলার ছাপিয়ে তা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে। তারা ডলার তৈরি করছে বাতাস থেকে, আবার তার ওপর সুদ চাপিয়ে ঋণ দিচ্ছে! যখন কেউ সুদ-সমেত ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তখন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে। এভাবে বিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেয় আধুনিক মহাজন বৃত্তি।

১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় ঘোষণা জারি করে, সবাই যেন এ বছরের মধ্যে তাদের সকল স্বর্ণ ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার সংগ্রহ করে; নতুবা তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ ফেডের কাছে স্বর্ণ জমা রাখতে বাধ্য হয় এবং এর বিনিময়ে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে।

৩১ জানুয়ারি, ১৯৩৪, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছ হতে নতুন ঘোষণা আসে। এখন থেকে ১ আউন্স স্বর্ণ সমান ৩৫ ডলার। অর্থাৎ ডলারের মূল্য রাতারাতি ৪০% হ্রাস পেল! কেনই-বা এমনটা হলো! ১৯১৩ সালের পর থেকে ফেড নতুন স্বর্ণ মজুত না করে প্রচুর নোট ইস্যু করেছে। এই মূল্যহীন নোটগুলোকে বলা হয় ‘Fiat Money’।

তাই নতুন ইস্যুকৃত নোটের সাথে রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে ডলারের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে এবং স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঠিক এ কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাজারের একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন অর্থের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাবগুলোর সাথে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত। যেমন : দ্রব্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, সঞ্চয় হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত নতুন নতুন নোট ইস্যু করা এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি করা মুদ্রাস্ফীতির প্রধানতম কারণ।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র ছয় মাস আগে আয়োজন করা হয় Bretton Woods সম্মেলন। বলার অপেক্ষা রাখে না ইহুদিরা ছিল এই সম্মেলনের মধ্যমণি। এতদিন পর্যন্ত ডলার ছিল কেবল আমেরিকার কারেন্সি। এই সম্মেলনে তারা প্রস্তাব করে, ডলার হবে পুরো পৃথিবীর একমাত্র বিনিময়যোগ্য কারেন্সি। বেশিরভাগ রাষ্ট্র এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। সবার এক কথা : ফেড তো চাইলেই ইচ্ছেমতো ডলার প্রিন্ট করতে পারে, সেখানে মনিটরিং-এর কোনো সুযোগ নেই।

বিতর্ক চলতে থাকল। ইহুদি প্রতিনিধিরা বলল, প্রতিটি দেশের পৃথক পৃথক কারেন্সি থাকার দরুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। সবাই যদি একই কারেন্সি ব্যবহারে সম্মত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গতিশীল হয়ে উঠবে। তা ছাড়া যুদ্ধের আঘাত পুরো ইউরোপকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এমতাবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে যে সম্পদ প্রয়োজন,  তা তাদের নেই।

হিটলারের সাবমেরিনের আঘাতে ইউরোপীয় অনেক স্বর্ণবাহী জাহাজ মেডিটেরিয়ান ও আটলান্টিকে হারিয়ে গেছে। সবাই এখন অর্থ সংকটে। এমতাবস্থায় ডলার হতে পারে সকল সমস্যার সমাধান। ফেড ডলার প্রিন্ট করে ঠিক, তবে নতুন কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করা হবে, যেখানে সকল দেশের অংশ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। স্বর্ণের বিপরীতে ডলারের মান হবে ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অধিকাংশ রাষ্ট্র এই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়।

আলোচনায় বলা হয়, যেহেতু এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিকট প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার নেই, তাই উচিত হবে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে থাকা নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার নিয়ে যাওয়া। আর যাদের স্বর্ণ নেই, তারা বন্ড জমা রেখে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ নিতে পারবে। প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ লেনদেনে নিজস্ব কারেন্সি ব্যবহার করতে পারবে। তবে অবশ্যই স্বর্ণ-রৌপ্য বা ডলারে পরিমাপযোগ্য মূল্য থাকতে হবে। অর্থাৎ কোন দেশ চাইলে স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিবর্তে ডলারকে রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিটি দেশের বিনিময় হার নিরূপণ ও মনিটরিং-এর দায়িত্বে থাকবে আই.এম.এফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক।

যদি কোনো দেশ ডলারগুলো ফেডের নিকট ফিরিয়ে দেয়, তবে প্রতি ৩৫ ডলার অনুপাতে সমপরিমাণ স্বর্ণ ফেরত দেওয়া হবে। এরপর থেকে অনেক রাষ্ট্র তাদের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলোর একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডের নিকট জমা রেখে ডলার নিতে শুরু করে। Tinmothy Green রচিত Central Bank Gold Reserves An Historical Perspective Since 1945 অনুযায়ী-ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর ১৯৪৫ সালে ফেডের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ ছিল ১৭৮৪৮ মেট্রিক টন। ১৯৫০ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০২৭৯ মেট্রিক টন। কিন্তু আমেরিকানদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এই যে শুরু হলো, আর থামল না।

এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় নিমজ্জিত থাকার দরুন তাদের ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। নতুন নতুন অস্ত্র নির্মাণ, সৈনিকদের বেতন প্রদান, বিভিন্ন রসদ আমদানি ইত্যাদি নানা কাজেও তাদের প্রচুর ডলার অন্যান্য দেশগুলোতে চলে যেতে শুরু করে। ফলে সে সকল ডলারের বিপরীতে যখন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো স্বর্ণ দাবি করে বসছিল, তখন আমেরিকা হারাতে শুরু করে তাদের স্বর্ণের মজুদ। কারণ, নতুন ডলার প্রিন্ট করলেও ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার হারে তখনও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

৬০’র দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পরা আমেরিকার জন্য ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বড়ো কারণ। তারা ভাবতেও পারেনি, এই যুদ্ধ এতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাদের ঘাটতি বাজেট বাড়তে শুরু করলে নতুন ডলার প্রিন্ট প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ১৯৬৩ সালে জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদে আসেন লিন্ডন বি. জনসন। তিনি স্বর্ণের বিপরীতে ডলারকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

কিন্তু ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ শুরু করে দেয় কি না, তা নিয়ে তার মনে ছিল যথেষ্ট সংশয়। তাই তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালাতে শুরু করেন, যেন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো আপাতত তাদের নিকট স্বর্ণ দাবি না করে।

১৯৬৮ সালের দিকে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ ৯৬৭৯ মেট্রিকটনে নেমে আসে। এমতাবস্থায় ডলার পুনর্মূল্যায়ন না করলে বাকি স্বর্ণগুলো আটকে রাখা যাবে না। ১৯৭১ সালে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন রিচার্ড নিক্সন। ততদিনে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯০৭০ মেট্রিক টন। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের অব্যাহত স্বর্ণের দাবিকে কূটকৌশলের মাধ্যমে কয়েক বছর দমিয়ে রাখলেও এ বছর আর সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে ফ্রান্সে চাপ ছিল অন্য সবার চেয়ে বেশি।

ফলে ১৫ আগস্ট, ১৯৭১, প্রেসিডেন্ট নিক্সন ব্রেটন উডস অঙ্গি কারনামা রহিত করেন। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ পরিশোধের প্রক্রিয়া রহিত করেন।  এরপর কয়েক দফা ডলারকে পুনর্মূল্যায়িত করা হয়, ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৮/৪০/৪২। কিন্তু ডলারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা পুনস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৩ সালে চূড়ান্তভাবে ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর হতে স্বর্ণের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন যে প্রক্রিয়ায় বিনিময় হার নির্ধারিত হয়, তা হলো-Floating Exchange Rate System।

এই আর্টিকেলটি নেওয়া হয়েছে গার্ডিয়ান থেকে প্রকাশিত ‘সিক্রেটস অব জায়োনিজম’ বই থেকে। 

বইটি জায়োনিজমের মুখোশ উন্মোচন করায় পশ্চিমে বহু দশক ধরে নিষিদ্ধ ছিল। বইটি অর্ডার করতে এই লিংকে ক্লিক করুন : অর্ডার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন