মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত?
মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত?
বিভিন্ন সময় এই প্রশ্নটি ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঠিক কত জন মানুষ শহীদ হয় এই ইতিহাস নিয়ে চলে রাজনীতি। কিন্তু, প্রকৃত সংখ্যা বের করার জন্য, সেটা প্রমাণের জন্য ঐভাবে উদ্যোগ নেয়া হয় না।
গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স প্রকাশিত ‘ইতিহাসের ছিন্নপত্র’ বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
সেখান থেকেই উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরছি:
১. “...বাংলাদেশে কোন পরিসংখ্যানই নির্ভরযোগ্য নয়। একটা নজীর-বিহীন বিপ্লব, একটা সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধের সময় হিসেব-নিকেশ পাওয়া তো আরো অসম্ভব, বিশেষ করে নিরপেক্ষ সংবাদ সংগ্রহের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে। প্রচারণার কাজে আমরা যারা লিপ্ত ছিলাম, হতাহতদের সংখ্যা সম্বন্ধে সাংবাদিকদের আমরা অনুমান-ভিত্তিক একটা হিসাব দিতাম। অভিজ্ঞতার আলোকে তারা আমাদের অনুমানের ওপর নির্ভর করতে শিখেছিলেন। আমাদের অনুমান মতো মুক্তিযুদ্ধে তিন লাখ মানুষ মারা গেছে বলে বিদেশী মিডিয়া খবর দিয়েছিলো। শেখ মুজিবুর রহমানকেও আমরা সে সংখ্যাই বলেছিলাম। কিন্তু ক্ল্যারিজেস হোটেলের সংবাদ সম্মেলনে এবং ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মুজিব ভাই তিন লাখকে কেন তিন মিলিয়ন (ত্রিশ লাখ) বলে উল্লেখ করেছিলেন তার কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাইনি। কোরিয়া কিংবা ভিয়েতনামে বছরের পর বছর স্থায়ী নৃশংস যুদ্ধেও আধ মিলিয়নের (পাঁচ লাখ) বেশি লোক মারা যায়নি।”
সূত্র: সিরাজুর রহমান, ইতিহাস কথা কয় ও নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ [শিকড়; ফেব্রুয়ারি, ২০০২। পৃ. ৭৮-৭৯]
২. "যেহেতু বঙ্গবন্ধু শহীদ-এর সংখ্যা “৩০ লাখ” বলেছিলেন, তাই জাতির জনকের মুখ থেকে বের হওয়া উক্ত সংখ্যাটিকেই দেশবাসী স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়ার সঠিক সংখ্যা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে আজও সেই সংখ্যাটি চালু আছে।
পঁচিশ বছর আগে ‘মিলিয়ন’ এবং ‘বিলিয়ন’ শব্দ দুটি বিদেশে বহুল প্রচলিত থাকলেও আমাদের দেশে ঐ ইংরেজি শব্দ দুটির ব্যবহার তখন খুবই সীমিত ছিল বিধায় একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার ধারণা ছিল যে, ‘এক মিলিয়ন’-এর অর্থ হচ্ছে ‘এক লাখ’। আসলে ‘এক মিলিয়ন’-এর অর্থ যে ‘দশ লাখ’ তা তখন জানতাম না। একাত্তরে আমি যখন বিভিন্ন প্রেস কনফারেন্সে ‘থ্রী মিলিয়ন’ শহীদ হওয়ার কথা বলেছিলাম তখন আসলে ‘তিন লাখ’ শহীদ হওয়ার কথাই বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার অজান্তেই ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার কথা বলেছিলাম। যার ফলে শ্রোতারা আমার বক্তব্যকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছিলেন। মিলিয়ন শব্দের সঠিক অর্থ না জেনে ভুল বলায় আসলে আমাদের উপকারই হয়েছিল।”
সূত্র: মুহাম্মদ নূরুল কাদির (এডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট। সাবেক ভ্রাম্যমাণ কূটনৈতিক প্রতিনিধি। মুজিবনগর সরকার।), দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা [মুক্ত প্রকাশনী; মার্চ, ১৯৯৭। পৃ. ৩৪৫-৩৪৬]
৩. "তিরিশ লাখ লোকের জীবনহানি হয়েছিলো বলে যে-দাবি করা হয়, তা কিংবদন্তী মাত্র। বাংলাদেশে ফিরে এসে শেখ মুজিব রেসকোর্সের ভাষণে তিরিশ লাখের কথা বলেছিলেন। তিনি অনুমান করেই বলে থাকবেন। তার কারণ, তিনি বন্দী ছিলেন পাকিস্তানের জেলে। সেখানে খবরাখবর জানার উপায় ছিলো না। আর দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে যারা ছিলেন, অথবা যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট অথবা আনুমানিক তথ্যও জানতে পারেননি। অথবা এমনও হতে পারে, তিনি ভুল তথ্য পেয়েছিলেন।
...যদি তিরিশ লাখ অথবা দশ লাখের বেশির অনুমানে অতিরঞ্জনও থাকে, তা হলে অন্তত তিন/চার লাখ লোক যে নিহত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ করার কারণ নেই।”
সূত্র: গোলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস [প্রথমা প্রকাশন; জানুয়ারি, ২০১০। পৃ. ১৬৭-১৬৮]
৪. "সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল নামক প্রসিদ্ধ সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধযোগে জানা যায়, তিনজন পশ্চিমা গবেষক অনুমান করিতেছেন ১৯৭১ সনের ‘যুদ্ধ-সংঘাতে’ বাংলাদেশে নিহত মানুষের সংখ্যা মোট ২৬৯,০০০ জন। যে জরিপের ভিত্তিতে এই. অনুমান তাহার নমুনা-পরিসর বেশ বড়ই, মোটামুটি ৩৬,০০০ পরিবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ২০০২-২০০৩ সনে ৭০টি দেশে পরিচালিত জরিপে পাওয়া তথ্যই এই অনুমানের ভিত্তি। তাহাদের অনুমানের গ-ি ১২৫,০০০ হইতে ৫০৫,০০০ এই দুই সংখ্যার মধ্যে আবদ্ধ।"
সূত্র: সলিমুল্লাহ খান, আদমবোমা [আগামী প্রকাশনী; মার্চ, ২০১৩। পৃ. ২৩৭]
৫. "তিরিশ লক্ষ তো নয়, আড়াই লক্ষও নয়। ঞযৎবব যঁহফৎবফ ঃযড়ঁংধহফ. এটা মোহাইমানের বইতে আছে। যারা মারা গেছে তাদের সবাই কিন্তু বাঙালি নয়। নির্মল সেনের মুখে শুনেছিলাম আড়াই লাখের মতো মানুষ মারা গেছে। তার মধ্যে এক লাখ বাঙালি, দেড় লাখ বিহারি এবং পাকিস্তানী। এই সত্যকে চেপে যাওয়া হয়েছে রাজনৈতিক সুবিধা পাবার জন্য।"
সূত্র: আহমদ শরীফ শ্রদ্ধাঞ্জলি (স্বদেশ চিন্তা সংঘ সংকলিত)। সম্পাদনা : আফজালুল বাসার [অনন্যা; ফেব্রুয়ারি, ২০০১। পৃ. ৩৪৫]
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে, রেফারেন্সসহ ঘটনাগুলো পড়তে অর্ডার করতে পারেন ‘ইতিহাসের ছিন্নপত্র’।






