ইরানের তেলে যেভাবে অ্যামেরিকার চোখ পড়ল
অ্যাংলো-পারসিয়ান অয়েল কোম্পানি কেবল
ইরানেই হস্তক্ষেপ করেনি, নাক গলিয়েছে পাশের
দেশ ইরাকেও। ১৯২১ সালে হাশেমিদের হাতে শাসনভার
ছেড়ে দেওয়ার পর মেসোপটেমিয়ার নতুন নাম হয় ইরাক। শাসনভার ছাড়লেও ইরাকের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের
হাতেই থাকে, সেখানে স্থাপিত হয় ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি।
ইরাকে যেসব ইংরেজ সামরিক কর্মকর্তা আসতেন, অ্যাংলো-পারসিয়ান অয়েল কোম্পানির কর্তাদের কথামতোই উঠবস করতেন তারা।
ইউরোপের দ্বিতীয় কোনো পরাশক্তি যাতে
ইরাক-ইরানের তেলভান্ডারে হাত দিতে না পারে, সেই চেষ্টায় কোনোরূপ কমতি রাখেনি ব্রিটেন। তবে ঘাড়ের কাছে এসে নিশ্বাস ফেলল ইউরোপের
বাইরে থেকে আসা নতুন এক বিপদ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্যে ভাগ বসাতে চাইল আমেরিকান
স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি। এমনকি কোম্পানিটিকে সুযোগ করে দিতে ইংরেজ সরকারের কাছে
নোট ইস্যু করে বসল খোদ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
লর্ড কার্জন তখন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আমেরিকার দাবি আমলেই নিলেন না তিনি। তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মধ্যকার বিরোধ
আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সানরেমো সম্মেলনের পর থেকে। এই আগুন উসকে দিতে বলশেভিকদের সাথে
কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে ব্রিটেন। তখনও ইরান ও ইরাকের তেলখনিগুলোতে
ব্রিটিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য। এর অনতিকাল পরই নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয় লাতিন আমেরিকা।
বিশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে মেক্সিকোর
বন্দরনগরী ট্যাম্পিকোতে জ্বালানি তেলের বিশাল মজুত আবিষ্কৃত হয়। শহরটি মেক্সিকোর দক্ষিণ-পূর্বে
এবং ভেরাক্রুজ অঙ্গরাজ্যের উত্তরে অবস্থিত। সে সময় ট্যাম্পিকো ছিল পুরো আমেরিকার প্রধান
তেল রপ্তানি কেন্দ্র এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যস্ততম বন্দর। বাণিজ্যিক গুরুত্বের জন্য
শহরটিকে তুলনা করা হতো ইতালির ভেনিস নগরীর সাথে।
১৯১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম হাওয়ার্ড
প্রশাসন এবং জার্মান সাম্রাজ্যের মদতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মেক্সিকোর ক্ষমতা দখল করেন
জেনারেল ভিক্টোরিয়ানো হুয়ের্তা। আমেরিকার চেষ্টায় ব্রিটেনসহ অনেকেরই সমর্থন পান হুয়ের্তা।
তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে অর্থের জোগান দেয় মেক্সিকান ইগল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি। এই
কোম্পানির প্রেসিডেন্ট তখন ইংরেজ তেল কারবারি হুইটম্যান পিয়ারসন। প্রথমাবস্থায় তাকে
নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসে। কাজেই তিনি যে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর
স্বার্থ দেখবেন, সেটা বলাই বাহুল্য। এ সময় মেক্সিকোর
অর্ধেক তেল উত্তোলন করত মেক্সিকান ইগল কোম্পানি। দৃশ্যপট পালটাতে শুরু করল, যখন আমেরিকার ক্ষমতায় বসলেন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। ভিক্টোরিয়ানোর
ওপর থেকে মার্কিন সমর্থন উঠিয়ে নিয়ে তিনি সশস্ত্র সমর্থন দিলেন মেক্সিকোর বিদ্রোহী
গোষ্ঠীগুলোকে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ব্রিটেনও তার আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে মন দিলো
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। মেক্সিকোর ক্ষমতায় এলেন উইলসন সমর্থিত জেনারেল ভেনুসতিয়ানো কারানজা।
নতুন সরকারকে ১ লাখ ডলার উপঢৌকন পাঠাল রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ন্ড অয়েল কোম্পানি। আর
এভাবেই ব্রিটিশদের হাত থেকে মার্কিন কবজায় চলে এলো মেক্সিকো।
সে সময় ট্যাম্পিকোতে দৈনিক গড়ে ২ লাখ
ব্যারেল তেল পাওয়া যেত। কিন্তু মার্কিন স্নেহধন্য কারানজা একসময় জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠেন, ফলে তাকে আর পছন্দ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। একসময়ের বন্ধু পরিণত
হয় ঘোর শত্রুতে। অবশ্য বিশ্বযুদ্ধের গোলযোগে ব্রিটিশ-মার্কিন তেলযুদ্ধ থেকে আপাত নিস্তার
পায় মেক্সিকো। গুপ্তহত্যার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে বহাল ছিলেন কারানজা।
রয়্যাল ডাচ সেলের প্রধান স্যার হেনরি
ডেটারডিং ছিলেন একজন ওলন্দাজ নাগরিক। চাকরি করতেন ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায়, সিভিল সার্ভিসের একজন অফিসার হিসেবে। হেনরি চাকরিরত অবস্থাতেই
পেট্রোলিয়ামের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ফলে ইন্দোনেশিয়ার তেল ব্যবহার
করে অল্প কদিনেই দ্যা রয়্যাল ডাচ অয়েল কোম্পানির প্রেসিডেন্ট বনে যান তিনি। হেনরি লন্ডনভিত্তিক
শেল ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির সাথে রয়্যাল ডাচ কোম্পানিকে একীভূত করেন।
অচিরেই এই মিত্রতা দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রাস্টে পরিণত হয়। তাদের পেছনে ছিল ব্রিটিশ
সরকারের সমর্থন। নতুন এই কোম্পানি রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানিকে টেক্কা
দিতে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে। আর এক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয় ক্যালিফোর্নিয়া
ওয়েল ফিল্ডস লিমিটেড ও রোক্সানা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি অব ওকলোহামাকে। এই দুই কোম্পানিরই
মালিক ছিল লন্ডনভিত্তিক কোম্পানি শেল।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে অ্যাংলো-পারসিয়ান
কোম্পানি নামে একটি তেল কোম্পানি করার পাশাপাশি সারাবিশ্বের তেল খুঁজতে ব্রিটিশ ফরেন
অফিস ও ইন্টেলিজেন্সের আওতায় খোলা হয় অন্য আরেকটি কোম্পানি। The d’Arcy
Exploitation Company নামের ওই কোম্পানিটি মধ্য আমেরিকা, চায়না, বলিভিয়া আর পশ্চিম আফ্রিকাতে বিশ্বের
অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এগিয়ে ছিল অনেকটাই। এ ছাড়া, ব্রিটিশ কন্ট্রোলড ওয়েলফিল্ডস বা বিসিও নামে আরেকটি কোম্পানি
ছিল। বাইরের লোকজন মনে করত এটি কানাডীয়, অথচ এটিও ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি। বিসিওর কাজ ছিল মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় রকফেলারের
কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে তেল অনুসন্ধান করা। ১৯১৮ সালে কোস্টারিকার তিনোকো
সরকারের পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন এনে দেয় বিসিও। এর বিনিময়ে পানামা সীমান্তের
কাছে সাত মিলিয়ন একর জায়গায় তেল উত্তোলনের সুবিধা লাভ করে তারা। পরে পানামার সাথে সীমান্ত
দ্বন্দ্বে কোস্টারিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপে নতুন সরকার এলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলা
তেল অনুসন্ধানের সুযোগ পায়। মার্কিন ব্যাংকগুলোও কোস্টারিকাকে সহজ শর্তে ঋণ দেয়। এরপর
বিসিও যায় ভেনিজুয়েলাতে। প্রভাবশালী শেল কোম্পানি ‘ভেনিজুয়েলা অয়েল কনসেশন লিমিটেড’
নামে একটি কোম্পানি খুলেছিল। শিগগিরই কোলন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি এবং স্ট্যান্ডার্ড
অয়েল কোম্পানি অব ভেনিজুয়েলাসহ আরও কিছু কোম্পানি আধিপত্যের লড়াইয়ে নামল। ভেনিজুয়েলা
হয়ে উঠল গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র। তখন ব্রিটেন বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো তেল নিয়ন্ত্রক শক্তি।
মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দুই-তৃতীয়াংশ তেলই ছিল তাদের দখলে। রাশিয়া, মেক্সিকো, ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ, রোমানিয়া, মিশর, ভেনিজুয়েলা, ত্রিনিদাদ, ইন্ডিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ চায়না এবং ফিলিপাইনের গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রগুলো
মোটামুটি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডেও ছিল ব্রিটিশ তেল
কোম্পানিগুলোর অবাধ বিচরণ।
কয়েক বছর বাদেই ডেটারডিং আর রকফেলার,দুজনই চাইলেন রাশিয়ার বাকুর তেলখনিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। তবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল রকফেলার। হেরি সিনক্লেইর-এর ‘আমেরিকান সিনক্লেইর পেট্রোলিয়াম কোম্পানি’ রুশ সরকারের সাথে চুক্তি করল বাকু আর শাখালিন দ্বীপপুঞ্জের তেল উত্তোলনের জন্য। প্রস্তাব করা হলো রাশিয়াকে দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ মালিকানা। সিনক্লেইর যুক্তরাষ্ট্র সরকার থেকে রাশিয়াকে অনেক ঋণ এনে দেন। এমনকি বলশেভিক সরকারের প্রতি মার্কিন স্বীকৃতিও এনে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ঘটনা হলো,সিনক্লেইর মূলত বাকুর চুক্তিটি করেছিলেন রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির হয়েই। পরে অবশ্য কাজটি থেমে যায়। সেইসাথে বলশেভিকদের প্রতি মার্কিন স্বীকৃতিও আটকে যায় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের তৎপরতায়।
লেখাটি নেওয়া হয়েছে গার্ডিয়ান থেকে
প্রকাশিত ‘ব্যাটল ফর পাওয়ার’ বই থেকে।
বইটিতে তেল রাজনীতির ভেতর-বাহির এবং তেল নিয়ে বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটি অর্ডার করতে ক্লিক করুন...






