ইসলামে রাষ্ট্র কেন গুরুত্বপূর্ণ? আমানত, আকাবার শপথ ও রাষ্ট্রের আখলাক
ইসলামে রাষ্ট্র কেন গুরুত্বপূর্ণ? আমানত, আকাবার শপথ ও রাষ্ট্রের আখলাক
ইসলামকে আমরা সাধারণত ইবাদত, চরিত্র আর পারিবারিক জীবনের ধর্ম হিসেবে চিনি। তাহলে রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ কেন আসে? রাষ্ট্র কি ধর্মের অংশ, নাকি রাজনীতির আলাদা জগৎ? এই প্রশ্নটাই রাষ্ট্রের আখলাক বইয়ের শুরুর কেন্দ্র। লেখক ড. ইউসুফ আল কারজাভি (১৯২৬–২০২২)। বইটির অনুবাদ গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত।
এই লেখায় রাষ্ট্রের আখলাক বইয়ের কিছু উল্লেখযোগ্য আলোচনা, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আমানত ও ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তবে বইটির পূর্ণাঙ্গ আলোচনা, লেখকের যুক্তি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে মূল বইটি পড়া জরুরি।
ড. ইউসুফ আল-কারজাভির রাষ্ট্রের আখলাক বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে, বইয়ের বিবরণ দেখতে এবং নমুনা পড়তে ভিজিট করুন Guardian Publications-এর ওয়েবসাইট।
রাষ্ট্রের আখলাক বইটি পড়ুন — Guardian Publications
প্রথম প্রশ্ন: ইসলামি জীবনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের জায়গা কোথায়?
লেখকের উত্তর তিনটি দিক থেকে আসে: কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ, ইসলামের ইতিহাস এবং ইসলামের নিজস্ব প্রকৃতি। তাঁর মতে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সে ব্যক্তি ও সমাজ, দুনিয়া ও আখিরাত, সবকিছু নিয়েই কথা বলে। মানবজীবনের নানা দিক সংশোধন ও পরিচালনার জন্য বিধান দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো রাষ্ট্র। এ কারণে তিনি মনে করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিষয়টি ইসলাম অবহেলা করতে পারে না।
পাঠক হিসেবে এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। এটি একটি যুক্তিকাঠামো, কোনো একক আয়াত বা হাদিসের সরাসরি সিদ্ধান্ত নয়। লেখক বিভিন্ন দলিল পাশাপাশি রেখে একটি সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এই পদ্ধতিটা মাথায় রাখলে বাকি আলোচনা বোঝা সহজ হয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: কুরআন এ বিষয়ে কী বলে?
বইয়ের প্রথম দিকে দুটি আয়াতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সূরা নিসার ৫৮ ও ৫৯ নম্বর। প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে, আর মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়ের সঙ্গে করতে। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ, রাসূল এবং "উলুল আমর" বা দায়িত্বশীলদের আনুগত্যের কথা এসেছে। বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে।
লেখক এখানে দুটি সূক্ষ্ম দিক দেখান। প্রথমত, আয়াত দায়িত্বশীলদের আনুগত্যকে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের পরে স্থান দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, আয়াতে "তোমাদের মধ্য থেকে" কথাটি আছে। তাঁর ব্যাখ্যায় এর অর্থ, নেতৃত্ব মুমিনদের মধ্য থেকেই আসবে এবং তাদের মাধ্যমেই নির্বাচিত হবে। এই পাঠ লেখকের নিজস্ব ব্যাখ্যা। আয়াতের শব্দ ও প্রয়োগ নিয়ে অন্য আলেমরাও আলোচনা করেছেন।
এর সঙ্গে তিনি সহিহ বুখারির একটি হাদিস যুক্ত করেন, যেখানে আমানত নষ্ট হওয়াকে কেয়ামতের আলামত বলা হয়েছে। লেখকের যুক্তি, আমানত ও ন্যায়বিচার নষ্ট হওয়া শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, গোটা সমাজের জন্য সতর্কসংকেত।
তৃতীয় প্রশ্ন: ছোট দলেও নেতৃত্ব লাগলে বড় সমাজে কী হবে?
বইয়ে ইসলামের শৃঙ্খলাপ্রিয়তার একটি সহজ চিত্র আছে। নামাজে কাতার সোজা করার নির্দেশ আছে। জ্ঞানী ব্যক্তিকে ইমামতির জন্য এগিয়ে দেওয়ার কথা আছে। সফরেও বলা হয়েছে, তিনজন বের হলে তারা যেন একজনকে আমির বানিয়ে নেয়।
শেষ হাদিসটি আবু দাউদে আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত (সুনানে আবু দাউদ ২৬০৮)। আলবানি এটিকে হাসান সহিহ বলেছেন, তবে সনদ নিয়ে অন্য কিছু মুহাদ্দিসের আপত্তিও আছে। তাই এটিকে একটি সহায়ক দৃষ্টান্ত হিসেবে পড়াই সংগত, একমাত্র ও চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়।
লেখক এখান থেকে যে যুক্তি টানেন তা সরল। ছোট একটি দলের জন্যই যদি নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়, তবে ন্যায়বিচার, জুমা, ঈদ, হুদুদ ও মজলুমের সহায়তার মতো বড় দায়িত্ব সংগঠিত ক্ষমতা ছাড়া কীভাবে সম্পন্ন হবে? বইয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার একটি আলোচনা উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ একে অপরের মুখাপেক্ষী, তাই সমাজ দরকার, আর সমাজের একজন নেতা দরকার।
চতুর্থ প্রশ্ন: ইতিহাস কী দেখায়?
ইতিহাসের অংশটি সবচেয়ে গল্পনির্ভর। বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, মদিনায় ইসলাম ছড়ানোর সময় আউস ও খাযরাজ গোত্রের ৭৩ জনের একটি দল হজের মৌসুমে রাসূল ﷺ-এর কাছে আসে। তাঁরা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের যেভাবে রক্ষা করেন, রাসূলকেও সেভাবে রক্ষার অঙ্গীকার করেন। তাঁরা তাঁর কথা শোনা ও মানার এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের কথাও বলেন। রাসূল ﷺ তাঁদের কাছে মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-কে পাঠান, যেন তিনি কুরআন শোনান ও ইসলাম শেখান।
এই আশ্বাস পাওয়ার পরই রাসূল ﷺ মদিনায় হিজরত করেন। লেখকের ভাষায় হিজরত ছিল এমন একটি অনন্য পদক্ষেপ, যার ওপর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের একটি ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। মদিনা হয়ে ওঠে নতুন রাষ্ট্রের কেন্দ্র, আর রাসূল ﷺ একসঙ্গে নবী ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কারণে ফকিহরা তাঁর কাজকে বিভিন্ন ভাগে বিশ্লেষণ করেছেন, আর তার একটি ভাগ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্ত।
লেখক হিজরতের আয়াতগুলোকেও এই চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেন, যেমন সূরা আনফাল ৮:৭২ ও সূরা নিসা ৪:৯৭–৯৯। তাঁর পাঠে মদিনায় যাওয়া ছিল একটি দায়িত্ব। তবে আয়াতগুলো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তার প্রয়োগ কতদূর, সে বিষয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে।
রাসূল ﷺ-এর ওফাতের পর সাহাবিদের প্রথম বড় কাজ কী ছিল? বইয়ের বর্ণনায় এটি ছিল নেতৃত্ব নির্ধারণ, এমনকি দাফনেরও আগে। সাহাবিরা প্রথমে আবু বকর রা.-এর হাতে বাইয়াত করেন, তারপর দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন। লেখক এ থেকে দেখান, তাঁরা এই বিষয়টিকে কতটা জরুরি মনে করতেন। (এই ঘটনার সূত্র সম্পাদকীয় পর্যায়ে মূল গ্রন্থ থেকে যাচাই করা দরকার।)
পঞ্চম প্রশ্ন: রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কি কেবল শাসন করা?
এখান থেকেই বইয়ের নামের ধারণা শুরু। লেখকের মতে ইসলামি রাষ্ট্র শুধু সীমানা রক্ষা বা বাইরের শত্রু ঠেকানোর ব্যবস্থা নয়। এর দায়িত্ব আরও বিস্তৃত: নাগরিকদের ইসলামি শিক্ষা ও মূল্যবোধে গড়ে তোলা এবং ইসলামি বিশ্বাস, চিন্তা ও শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উপযোগী একটি পরিবেশ তৈরি করা। সূরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত এই ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে ক্ষমতা পেলে সালাত কায়েম, যাকাত প্রদান এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের কথা এসেছে।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে তিনি আরও একটি পর্যবেক্ষণ রাখেন। তাঁর মতে এখন রাষ্ট্র প্রযুক্তি ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধ গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই রাষ্ট্র মূল্যবোধের দিক থেকে নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। কোনো না কোনো আদর্শ তাকে চালায়। এটি লেখকের বিশ্লেষণ। পাঠক চাইলে এ নিয়ে নিজের প্রশ্ন ও ভিন্ন মত নিয়ে ভাবতে পারেন।
এই ভাবনার ভিত্তিতেই তিনি "আখলাকি রাষ্ট্র" ধারণাটি দাঁড় করান। এমন রাষ্ট্র নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, মানুষের মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, এবং জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি ও বংশ রক্ষার নীতির ওপর দাঁড়াবে। সূচি অনুযায়ী পরের অংশে জ্ঞান, সৎকর্ম, স্বাধীনতা, শুরা, আমানত ও ন্যায়বিচার নিয়ে আলাদা আলোচনা আছে। নমুনায় সেগুলো নেই, তাই সেগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে এখানে কিছু বলা হলো না।
এই আলোচনা থেকে পাঠক কী নিতে পারেন, আর কী নয়
নমুনা অংশ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, লেখক রাষ্ট্রকে ইসলামের নির্দেশ বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন এবং আমানত ও ন্যায়কে তার নৈতিক ভিত্তি বলেন। এটাও বোঝা যায় যে তাঁর যুক্তি কুরআন, হাদিস ও প্রাথমিক ইতিহাসের সমন্বয়ে গঠিত।
কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর এই অংশে নেই। আজকের কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তার বিস্তারিত নকশা এখানে পাওয়া যায় না। ইসলামি রাষ্ট্রের রূপ ও প্রয়োগ নিয়ে সমকালীন আলেম ও গবেষকদের মধ্যেও ভিন্ন মত আছে। তাই এই লেখাকে বিতর্কের শেষ কথা নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারার ভূমিকা হিসেবে পড়াই ভালো।
বইটি কার জন্য
যিনি ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তা, নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব বা আমানতের ধারণা বুঝতে চান, তাঁর জন্য এই বইয়ের সূচনা একটি ভালো প্রবেশদ্বার হতে পারে। গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সের ওয়েবসাইটে রাষ্ট্রের আখলাক বইটির পাতায় বিবরণ ও "একটু পড়ে দেখুন" অংশ আছে। একই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে চাইলে লেখকের পাতায় যাওয়া যায়।






