• মূলপাতা
  • ক্যাটাগরি
  • ক্রয় তালিকা
  • লগইন

মোট আইটেম (০)

আপনার ক্রয় তালিকা খালি

ক্যাটাগরি

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত গার্ডিয়ান পাবলিকেশনস

মওদূদীকে ঘিরে ৩৮টি অভিযোগ: দাবি, প্রেক্ষাপট ও বিতর্কের পর্যালোচনা
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মওদূদীকে ঘিরে ৩৮টি অভিযোগ: দাবি, প্রেক্ষাপট ও বিতর্কের পর্যালোচনা

মওদূদী কি সত্যিই নবী-সাহাবাদের অবমাননা করেছিলেন? ৩৮টি অভিযোগের নেপথ্যে যে সত্য প্রায় কেউ জানে না

ভূমিকা: একটি প্রশ্ন যা বারবার ফিরে আসে


"মওদূদী নবীদের গুনাহগার বলেছেন", "মওদূদী সাহাবাদের গালি দিয়েছেন", "মওদূদী কুরআনের বিকৃতির কথা বলেছেন",এই ধরনের বাক্য ফেসবুক, ইউটিউব বা মসজিদের মিম্বার থেকে কমবেশি প্রায় সবাই কখনো না কখনো শুনেছেন। তালিকাটি প্রায়ই ৩৫-৪০টি পয়েন্টে বিস্তৃত হয়, প্রতিটি পয়েন্টের সঙ্গে থাকে একটি বই-পৃষ্ঠার রেফারেন্স। দেখতে এতটাই "গবেষণাধর্মী" লাগে যে অনেক সময় জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক বা সহানুভূতিশীল মানুষও এসব প্রশ্নের সামনে থমকে যান, উত্তর দিতে পারেন না, আর নীরবে সরে যান অথবা প্রশ্নটাকেই এড়িয়ে যান।

এই লেখাটি লেখা হয়েছে ঠিক এই শূন্যতা পূরণের জন্য। আমরা এখানে দুটি সরাসরি বিপরীতমুখী উৎস মুখোমুখি রেখে বিশ্লেষণ করব,একদিকে মওদূদী-বিরোধী অভিযোগের তালিকা (যেমন "মুসলিমবাংলা" ফতোয়া বিভাগের প্রকাশিত দীর্ঘ ফতোয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ৩৮ দফা অভিযোগ), অন্যদিকে "জামায়াতে ইসলামীর আকিদা" (সংকলক: আলী হাসান উসামা) গ্রন্থে উপস্থাপিত মূল উৎস-ভিত্তিক জবাব। লক্ষ্য একটাই,কে সঠিক তা চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা নয়, বরং প্রতিটি অভিযোগের পেছনের প্রেক্ষাপট, মূল উদ্ধৃতি এবং উভয় পক্ষের যুক্তি একসঙ্গে দেখানো, যাতে পাঠক নিজেই বিচার করতে পারেন।

প্রথমেই একটা কথা স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার,এই বিতর্ক নতুন নয়, এবং এতে জড়িত ব্যক্তিরা কেউই "ভিলেন" নন। মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ., হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.-এর মতো সম্মানিত আলেমরা যেমন প্রকৃত আপত্তি তুলেছিলেন, তেমনি মওদূদী স্বয়ং তাঁর জীবদ্দশায় সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। এটি তাই একই সঙ্গে একটি আকিদাগত আলোচনা এবং একটি পদ্ধতিগত (কীভাবে উদ্ধৃতি ব্যবহার করা উচিত) আলোচনা।


যে পদ্ধতিগত সমস্যাটি প্রথমে বোঝা দরকার


মওদূদী-বিরোধী তালিকাগুলো ঘেঁটে দেখলে কয়েকটি সাধারণ প্যাটার্ন চোখে পড়ে।

প্রথমত, অনেক উদ্ধৃতি প্রসঙ্গবিচ্যুত। একটি দীর্ঘ আলোচনার মাঝখান থেকে একটি বাক্য কেটে নিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সেটাই লেখকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত,অথচ প্রায়শই সেই বাক্যের ঠিক পরের অনুচ্ছেদেই লেখক নিজের বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করেছেন বা ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, একই ধরনের বক্তব্য ইতিহাসের স্বীকৃত আলেমদের রচনাতেও পাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে তা বিতর্কের জন্ম দেয়নি। "জামায়াতে ইসলামীর আকিদা" গ্রন্থে সংকলক উদাহরণ দিয়েছেন,নবীদের ক্ষণিক পদস্খলন নিয়ে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর "আল ফিকহুল আকবার"-এও অনুরূপ আলোচনা রয়েছে, অথচ একই ধরনের কথা মওদূদী লেখায় তাঁকে "নবীবিদ্বেষী" আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে একই তালিকা কপি-পেস্ট হতে হতে মূল উৎস যাচাই করার প্রবণতা কমে গেছে,রেফারেন্স "তাফহীমাত ২/৪৩" লেখা থাকলেই অনেকে ধরে নেন তা সঠিক, অথচ বাস্তবে যাচাই করলে অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধৃতির শব্দচয়ন, অনুবাদ বা প্রেক্ষাপটে গরমিল পাওয়া যায়।

এই তিনটি সমস্যা মাথায় রেখেই এখন নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো একে একে দেখা যাক।


অভিযোগ বিভাগ ১: আল্লাহ ও ফেরেশতা সম্পর্কিত


অভিযোগ: মওদূদী নাকি লিখেছেন, নর-নারীর অবাধ মেলামেশার সমাজে রজমের শাস্তি প্রয়োগ করা "জুলুম"; এবং ফেরেশতাদের তিনি প্রায় মুশরিকদের দেবদেবীর সমতুল্য বলেছেন।

পর্যালোচনা: এই দুটি অভিযোগই এমন প্রকৃতির যে এগুলোর সঠিক মূল্যায়নের জন্য "তাফহীমাত"-এর সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ প্রেক্ষাপটসহ পড়া আবশ্যক,একটি একক বাক্য দিয়ে কারও আকিদা নির্ধারণ করা পদ্ধতিগতভাবে সমস্যাজনক। মূলনীতি হিসেবে, ইসলামি হদ (শরীয়া-নির্ধারিত শাস্তি) বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে সামাজিক পরিবেশ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আলোচনা করা এবং হদ নিজেই অস্বীকার করা,এ দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, এবং ফিকহের ক্লাসিক্যাল সাহিত্যেও "হদ প্রয়োগের শর্তাবলি" নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে (যেমন সন্দেহজনক অবস্থায় হদ স্থগিত রাখার নীতি,"হুদূদ তুদরাউ বিশ শুবুহাত")। পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, এই নির্দিষ্ট উদ্ধৃতিটি মূল "তাফহীমাত" গ্রন্থ থেকে পূর্ণ প্রসঙ্গসহ নিজে যাচাই করে দেখার জন্য, কারণ একতরফা তালিকায় এই ধরনের স্পর্শকাতর বক্তব্য বিশেষভাবে বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।


অভিযোগ বিভাগ ২: নবীদের মাসুমিয়াত (নিষ্পাপত্ব)


অভিযোগ: মওদূদী প্রায় প্রতিটি নবী,আদম, নূহ, মুসা, দাউদ, ইউনুস, এমনকি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম,সম্পর্কে "গুনাহ" বা "মানবিক দুর্বলতা"র কথা বলেছেন।

পর্যালোচনা: এখানে বোঝা জরুরি, ইসলামি আকিদাশাস্ত্রে "ইসমাত" বা নিষ্পাপত্বের ধারণার দুটি স্তর রয়েছে,নবুওয়তি দায়িত্ব পালনে (ওহী গ্রহণ ও প্রচারে) সম্পূর্ণ নিষ্পাপত্ব, যা সর্বসম্মত; এবং নবুওয়তের পূর্বে বা ব্যক্তিগত/মানবিক পর্যায়ে ক্ষণিক পদস্খলনের (যাল্লাহ) সম্ভাবনা, যা নিয়ে ক্লাসিক্যাল আলেমদের মধ্যেই মতভেদ আছে। কুরআন নিজেই হযরত আদম আ.-এর নিষিদ্ধ বৃক্ষ থেকে খাওয়া (সূরা ত্বহা), হযরত ইউনুস আ.-এর ধৈর্যহারা হয়ে চলে যাওয়া (সূরা আম্বিয়া, সূরা কলম), হযরত মুসা আ.-এর অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড (সূরা কাসাস),এসব ঘটনা বর্ণনা করেছে। তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে কুরতুবী, ইমাম রাজীর তাফসীরে কাবীরসহ বহু ক্লাসিক্যাল তাফসীরে এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় "যাল্লাহ" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ক্ষণিক ভুল বা পদস্খলন,গুনাহে কবীরা নয়।

মওদূদীর বক্তব্যকে এই ক্লাসিক্যাল আলোচনার পটভূমিতে রেখে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি মূলত এই একই ধরনের আলোচনা তাঁর নিজস্ব ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন,তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন (যেমন সরাসরি "গুনাহ" শব্দের ব্যবহার, প্রেক্ষাপট ছাড়া), তা কি ক্লাসিক্যাল আলেমদের সতর্ক, সম্মানসূচক ভাষার সমতুল্য ছিল? এই প্রশ্নেই মূল বিতর্কের কেন্দ্র। "জামায়াতে ইসলামীর আকিদা" গ্রন্থ স্বীকার করেছে যে এই বিষয়ে মওদূদীর জীবদ্দশাতেই সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. গঠনমূলক আপত্তি তুলেছিলেন, আর মওদূদী তা স্বীকার করে নিয়েছিলেন এবং ভবিষ্যতেও এমন সমালোচনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য,কারণ এটি প্রমাণ করে মওদূদী নিজেকে অভ্রান্ত দাবি করেননি, এবং এই নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে একটি বৈধ আকিদাগত মতভেদ বিদ্যমান, যা নিছক অপপ্রচার নয়।

স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে "রেসালতের দায়িত্ব পালনে ভুলত্রুটি"-জাতীয় বক্তব্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এখানে লক্ষণীয়, "তাফহীমুল কুরআন"-এর সূরা তাওবা বা সূরা আবাসার তাফসীরে নবীজির কিছু সিদ্ধান্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংশোধনী (যেমন সূরা আবাসার প্রেক্ষাপট, বদর যুদ্ধের বন্দি প্রসঙ্গে সূরা আনফালের আয়াত) কুরআনেই বর্ণিত,এটি ক্লাসিক্যাল তাফসীরেও স্বীকৃত একটি বিষয়। তবে এই আয়াতগুলোকে ভিত্তি করে যে ভাষায় ও যে মাত্রায় মওদূদী আলোচনা করেছেন, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, এবং এখানে "সবই ভিত্তিহীন অপপ্রচার" বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন সঠিক নয়, তেমনি "সবই কুফরি" বলে ঘোষণা দেওয়াও অতিসরলীকরণ।


অভিযোগ বিভাগ ৩: সাহাবায়ে কিরাম


অভিযোগ: "খেলাফত ও মুলুকিয়াত" গ্রন্থে হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের সমালোচনা এবং সাহাবাদের "মানবিক দুর্বলতা"র কথা বলা।

পর্যালোচনা: এটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রচারিত অভিযোগ। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, "খেলাফত ও মুলুকিয়াত" মূলত একটি ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, যেখানে খেলাফতে রাশেদা থেকে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আলোচিত হয়েছে। একই ধরনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ,উমাইয়া যুগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাহাবাদের পারস্পরিক মতবিরোধ (জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধ) নিয়ে,দেওবন্দি ঘরানার প্রখ্যাত আলেম মুফতী তাকী উসমানীর "ইতিহাসের কাঠগড়ায় হযরত মুআবিয়া" এবং মওলানা শামসুল হক ফরিদপুরীর "ভুল সংশোধন" গ্রন্থেও পাওয়া যায়,এই গ্রন্থগুলো আহলে সুন্নাতের গণ্ডির মধ্যেই স্বীকৃত। ফলে প্রশ্ন ওঠে,রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করা মাত্রই কি "সাহাবা-বিদ্বেষ" বলে গণ্য হবে?

দ্বিতীয়ত, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো, সাহাবাদের পারস্পরিক ইজতিহাদি মতবিরোধের ক্ষেত্রে (যেমন জামাল-সিফফিনের ঘটনা) যে-কোনো পক্ষকে অনুসরণ করলেই তা হেদায়াতপ্রাপ্ত বলে গণ্য হয়,কাউকে চূড়ান্তভাবে "ভুল" আখ্যা দেওয়া হয় না, বরং তা ইজতিহাদি ভুল হিসেবে বিবেচিত হয় যা গুনাহ নয়। এই মূলনীতির সঙ্গে "খেলাফত ও মুলুকিয়াত"-এর বিশ্লেষণী পদ্ধতি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা একটি বৈধ প্রশ্ন, এবং এখানেই প্রকৃত মতভেদের জায়গা, যা নিছক গালিগালাজ নয় বরং পদ্ধতিগত আপত্তি।

তবে একই সঙ্গে এটাও লক্ষণীয়, "সাহাবায়ে কিরাম সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন" জাতীয় যে উদ্ধৃতি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, তার প্রকৃত প্রসঙ্গ হলো,সাহাবাদের ব্যক্তিগত দ্বীনদারি, তাকওয়া বা জান্নাতী মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়, বরং "সাহাবা হওয়া মাত্রই ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে",এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি প্রায়ই তালিকায় হারিয়ে যায়।


অভিযোগ বিভাগ ৪: কুরআনের হেফাজত ও তাফসীর


অভিযোগ: কুরআনের তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষা পর্দার আড়ালে চলে গেছে, তাফসীরের প্রয়োজন নেই, একজন প্রফেসরই যথেষ্ট।

পর্যালোচনা: "কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা" গ্রন্থে মওদূদীর মূল যুক্তি ছিল,ইলাহ, রব, দ্বীন ও ইবাদত শব্দের ব্যবহারিক অর্থ কালক্রমে সংকীর্ণ হয়ে গেছে এবং এর ফলে কুরআনের বার্তা বোঝায় প্রভাব পড়েছে। এটি শব্দের সংরক্ষণ নিয়ে বক্তব্য নয়, বরং শব্দের প্রায়োগিক অর্থের ঐতিহাসিক রূপান্তর নিয়ে বক্তব্য। এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলাই এই অভিযোগের মূল সমস্যা। মওদূদী নিজেই সূরা হিজরের ৯ নম্বর আয়াত ("নিশ্চয়ই আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই তা সংরক্ষণ করব") উদ্ধৃত করে কুরআনের আক্ষরিক সংরক্ষণে দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন,এবং এটি তাঁর সমগ্র জীবনের কাজ, বিশেষত "তাফহীমুল কুরআন"-এর মতো ছয় খণ্ডের বিশাল তাফসীর রচনা, এর বিপরীত প্রমাণ। যিনি নিজে কুরআনের একটি সম্পূর্ণ তাফসীর লিখে গেছেন, তিনি "তাফসীরের প্রয়োজন নেই" বলে বিশ্বাস করতেন, এই দাবিতে একটি সুস্পষ্ট অভ্যন্তরীণ অসংগতি রয়েছে, যা পাঠকদের নিজেরাই যাচাই করে দেখা উচিত।


অভিযোগ বিভাগ ৫: হাদিস ও তাকলীদ


অভিযোগ: হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা অস্বীকার, এবং তাকলীদকে "কবীরা গুনাহের চেয়েও জঘন্য" বলা।

পর্যালোচনা: হাদিস প্রসঙ্গে, "রাসায়েল ও মাসায়েল" গ্রন্থে খবরে ওয়াহিদ (একক সূত্রে বর্ণিত হাদিস) এবং আকিদার মৌলিক বিষয়ের মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা মূলত একটি উসূলে হাদিস (হাদিসশাস্ত্রের পদ্ধতি) সংক্রান্ত ক্লাসিক্যাল বিতর্কের প্রতিধ্বনি,এই একই আলোচনা হানাফি উসূল গ্রন্থাবলিতেও পাওয়া যায় (খবরে ওয়াহিদ দ্বারা আকিদা প্রতিষ্ঠিত হয় কিনা,এই প্রশ্নে হানাফি ও অন্যান্য মাযহাবের মধ্যে সুপ্রাচীন মতভেদ রয়েছে)। এটিকে "হাদিস অস্বীকার" বলা এবং "হাদিসশাস্ত্রের একটি ক্লাসিক্যাল পদ্ধতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করা",এ দুটো ভিন্ন বিষয়।

তাকলীদ প্রসঙ্গে, মওদূদী ব্যক্তিজীবনে মূলত হানাফি ফিকহ অনুসরণ করতেন এবং তাঁর বহু রচনায় হানাফি অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর সমালোচনা মূলত ছিল একজন আলেমের জন্য দলিল-প্রমাণ যাচাই ছাড়া অন্ধ তাকলীদ নিয়ে, সাধারণ মুসলমানদের মাযহাব অনুসরণের বিরুদ্ধে নয়। এই অবস্থান ইবনে তাইমিয়া, ইমাম শাওকানীসহ ইতিহাসের একাধিক স্বীকৃত আলেমের অবস্থানের সমগোত্রীয়,নতুন কোনো "লা-মাযহাবী" উদ্ভাবন নয়।


অভিযোগ বিভাগ ৬: দ্বীন = রাষ্ট্র, ইবাদত = ট্রেনিং কোর্স


অভিযোগ: দ্বীন মূলত রাষ্ট্রের নাম, নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত ইবাদত নয় বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার "ট্রেনিং কোর্স"।

পর্যালোচনা: এই অভিযোগটি "কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা" ও "খুতবাত" গ্রন্থ থেকে নেওয়া উদ্ধৃতির ভিত্তিতে দাঁড় করানো হয়। মূল বক্তব্য অনুযায়ী, মওদূদী দ্বীনের একটি রাজনৈতিক ও সামষ্টিক মাত্রা তুলে ধরতে চেয়েছেন,ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং জীবনের সামষ্টিক দিক (রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সমাজ) পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ বিধানও বটে। তবে তিনি যখন ইবাদতগুলোকে "ট্রেনিং কোর্স" বলেছেন এবং এই বাক্যাংশ থেকে যদি এই অর্থ দাঁড় করানো হয় যে নামায-রোযা স্বাধীন কোনো মূল্য বহন করে না, তবে তা নিঃসন্দেহে আহলে সুন্নাতের মূলধারার আকিদার (হাদিসে জিবরাঈল অনুযায়ী ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ স্বতন্ত্র ইবাদত) সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। "জামায়াতে ইসলামীর আকিদা" গ্রন্থে এই বিশেষ বিষয়ে সরাসরি আলোচনা তুলনামূলক কম থাকায়, এই নির্দিষ্ট অভিযোগে পাঠকদের বিশেষভাবে সতর্কতার সঙ্গে "খুতবাত" ও "কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা" গ্রন্থ স্বয়ং পাঠ করে দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, কারণ এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সমালোচকদের যুক্তির ওজন তুলনামূলক বেশি বলে অনেক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকও মনে করেন।


জামায়াতে ইসলামী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কী বলে?

এই সব বিতর্কের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রায়ই আলোচনায় আসে না,জামায়াতে ইসলামী নিজেই মওদূদীকে আকিদা বা ফিকহের অভ্রান্ত ইমাম মনে করে না। গঠনতন্ত্রের ২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, জামায়াতের অনুসৃত আকিদা কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্দেশিত আকিদা,মওদূদী বা অন্য কারও ব্যক্তিগত মতামত নয়। অধ্যাপক গোলাম আযম তাঁর "ইকামাতে দ্বীন" গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন, মওদূদীর প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, এমনকি ব্যক্তিগতভাবে কিছু বিষয়ে দ্বিমতও থাকতে পারে। মওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও তাঁর "আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি" গ্রন্থে একই কথা বলেছেন।

এই বাস্তবতা বোঝা জামায়াত-সমর্থক ও সমালোচক,উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। যারা প্রতিটি অভিযোগকে "জামায়াতের আকিদা"র বিরুদ্ধে আক্রমণ মনে করে রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েন, তাঁদের জন্য এটি স্বস্তির বিষয় যে সংগঠনটি নিজেই মওদূদীর অভ্রান্ততা দাবি করে না। আবার যারা মনে করেন "মওদূদীর একটি ভুল বক্তব্য মানেই পুরো জামায়াত কাফের", তাঁদেরও এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি,একজন লেখকের নির্দিষ্ট কিছু বক্তব্যে দ্বিমত থাকা এবং একটি সমগ্র সংগঠনকে ইসলামের গণ্ডির বাইরে ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত। এই বিষয়ে মওদূদীর রচনাবলি থেকে উদ্ধৃতি, ঈমান, তাওহিদ, রিসালাত ও সাহাবিদের বিষয়ে তাঁর আকিদা নিয়ে সংকলিত আলোচনা পড়তে [জামায়াতে ইসলামীর আকিদা] বইটি দেখা যেতে পারে।


সৎ স্বীকারোক্তি: কোথায় প্রকৃত মতভেদ থেকে যায়


এই লেখার উদ্দেশ্য একতরফা প্রচারণা নয়। তাই সততার সঙ্গে বলা দরকার,উপরের বিশ্লেষণে প্রতিটি অভিযোগ যে সমান শক্তিশালী বা সমান দুর্বল, তা নয়। কিছু অভিযোগ (যেমন কুরআনের হেফাজত, হাদিসের প্রয়োজনীয়তা) স্পষ্টভাবে প্রসঙ্গবিচ্যুত উদ্ধৃতি বা ভুল ব্যাখ্যার ফল। কিন্তু কিছু অভিযোগ (যেমন নবীদের প্রসঙ্গে ভাষার তীক্ষ্ণতা, "দ্বীন = রাষ্ট্র" তত্ত্বে ইবাদতের স্বতন্ত্র মূল্য খাটো করা, সাহাবাদের রাজনৈতিক ইতিহাস আলোচনার ভাষাশৈলী) নিয়ে স্বীকৃত আলেমদের মধ্যেই প্রকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ বিদ্যমান, যা নিছক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা হবে। মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ., হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ., ইউসুফ বিন্নুরী রহ.-এর মতো আলেমদের সমালোচনা নিছক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে আসেনি,তাঁরা প্রকৃত আকিদাগত ঝুঁকি অনুভব করেছিলেন বলেই লিখেছেন।


উপসংহার: কী করা উচিত পাঠকের


এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হলো সাধারণ মুসলমান, যারা প্রতিটি পক্ষের একতরফা প্রচারণার মধ্যে পড়ে বিভ্রান্ত হন এবং কোনো পক্ষকে যাচাই না করেই সমর্থন বা বিরোধিতা করেন। জামায়াতের যেসব সমর্থক এই প্রশ্নের সামনে নিরুত্তর হয়ে যান, তাঁদের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো,প্রতিটি অভিযোগকে ভয় না পেয়ে, বরং মূল গ্রন্থ (তাফহীমুল কুরআন, খেলাফত ও মুলুকিয়াত, রাসায়েল ও মাসায়েল, কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা) সরাসরি প্রেক্ষাপটসহ পড়ে নিজে যাচাই করা। একইভাবে যারা তালিকাটি বিশ্বাস করে মওদূদীকে সরাসরি কাফের-মুরতাদ আখ্যা দিয়ে দেন, তাঁদেরও উচিত মূল সূত্র যাচাই করা, কারণ অনেক অভিযোগই মূল রচনার সঙ্গে হুবহু মেলে না।

সত্য সবসময় প্রচারণার মাঝামাঝি কোথাও লুকিয়ে থাকে না,কখনো তা একপক্ষের কাছে বেশি, কখনো অন্যপক্ষের কাছে। এই লেখার লক্ষ্য কাউকে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্ন ও প্রেক্ষাপট হাতে তুলে দেওয়া।


আপনার মন্তব্য লিখুন